ফিউচার অফ স্কিলস: টিকে থাকতে হলে শুধু ‘স্কিল’ না, লাগবে ‘এজেন্সি’ (Agency)
Dan Koe এর পডকাস্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সহজ ভাষায় আপনাদের জন্য আমার এক্সপেরিয়েন্স যুক্ত করে লিখলাম
আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে আপনার আজকের শেখা বা গর্ব করার মতো বেশিরভাগ ‘হার্ড স্কিল’ (Hard Skill) অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। কথাটা শুনে হয়তো অনেকের গায়ে লাগতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই।
আমি Dan Koe এর বেশ বড় রকমের ভক্ত। আজ সকালে হাতিরঝিলে ~৪ কিলো দৌড়ানোর সময় তার পডকাস্ট শোনার সময় ভাবছিলাম, বাসায় ব্যাক করে সহজ ভাষায় আমার নিজের অডিয়েন্স এর জন্য তার পডকাস্টের বিষয়বস্তু লিখে ফেলবো।
তার মূল পডকাস্ট শুনতে বা ইউটিউবে দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে টুলস এবং টেকনোলজি প্রতি মুহূর্তে পাল্টাচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ আসলে কাদের? ভবিষ্যৎ তাদের, যারা বোঝে যে—
AI-এর প্রয়োজন সঠিক ডিরেকশন বা দিকনির্দেশনা।
টুলসের প্রয়োজন একজন দক্ষ মাস্টার।
ডাটার প্রয়োজন গভীর ইনসাইট।
সফলতার জন্য প্রয়োজন ক্লিয়ার ভিশন।
আজকের এই লেখাটা তাদের জন্য, যারা গতানুগতিক ‘র্যাট রেইস’ (Rat Race) থেকে বের হয়ে নিজের ক্যারিয়ার এবং জীবনের কন্ট্রোল নিজের হাতে নিতে চান। আজকে আমরা কথা বলবো ‘এজেন্সি’ (Agency) নিয়ে—যা আপনার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্কিল হতে যাচ্ছে।
১. এজেন্সি (Agency): অনুমতি ছাড়াই বারবার চেষ্টা করার ক্ষমতা
অনলাইনে বা মোটিভেশনাল স্পিকারদের কাছে ‘এজেন্সি’র অনেক সংজ্ঞা শুনবেন। কেউ বলবে এটা “কাজের ক্ষমতা”, কেউ বলবে “লিডারশিপ”। কিন্তু আমার ১২+ বছরের ক্যারিয়ার এবং ৩টি বিজনেস দাঁড় করানোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি এজেন্সিকে একটু অন্যভাবে ডিফাইন করি।
এজেন্সি হলো অনুমতি ছাড়া ‘ইটারেট’ (Iterate) বা বারবার চেষ্টা করার ক্ষমতা।
আমাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—”অনুমতি নাও”। টয়লেটে যেতে অনুমতি লাগে, কথা বলতে অনুমতি লাগে, এমনকি ক্যারিয়ার চুজ করতেও বাবা-মা বা সমাজের ‘ভ্যালিডেশন’ বা অনুমতি লাগে। এই মানসিকতা আমাদের ‘কনফর্মিষ্ট’ (Conformist) বা প্রথাগত মানুষে পরিণত করে।
কিন্তু একজন হাই এজেন্সি (High Agency) সম্পন্ন মানুষ কারো অনুমতির অপেক্ষা করে না।
২০১৭ সালে যখন আমি পাঠাও-এর মতো হাই-পেইড জব ছেড়ে ঋণ নিয়ে ‘এন্ডিং সিন’ (EndingScene) শুরু করি, তখন আমি কারো অনুমতির অপেক্ষা করিনি। আমি জানতাম, আমাকে শুরু করতে হবে, ভুল করতে হবে, এবং সেই ভুল থেকে শিখে আবার চেষ্টা (Iterate) করতে হবে।
বেশিরভাগ মানুষ ভাবে, “বস বললে কাজ করবো, না বললে বসে থাকবো।” এটা হলো লো-এজেন্সি মেন্টালিটি। আর হাই-এজেন্সি মানুষরা ভাবে, “গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে আমাকে কী করতে হবে? রাস্তা না থাকলে রাস্তা বানিয়ে নিব।”
বাস্তবতা: আপনি যদি এখনো ভাবেন যে ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটি আপনাকে বাঁচাবে, তবে ভুল ভাবছেন। ডিগ্রি আপনাকে একটা এন্ট্রি লেভেল জব দিতে পারে, কিন্তু টপে উঠতে হলে আপনাকে ‘ইটারেট’ করা শিখতে হবে। ভুল করা কোনো পাপ না, ভুল থেকে না শেখাটা পাপ।
২. জীবনটাকে একটা ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে দেখা (Life as an Experiment)
লো-এজেন্সি মানুষরা জীবনকে দেখে একটা ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ হিসেবে। তাদের কাছে জীবন মানে হলো—স্কুল শেষ করো, ভার্সিটিতে পড়ো, সিজিপিএ ভালো করো, একটা ‘সিকিউরড’ চাকরি নাও, বিয়ে করো, বাচ্চা নাও, তারপর রিটায়ার করো। ব্যাস!
কিন্তু হাই-এজেন্সি মানুষরা জীবনকে দেখে একটা বিশাল বড় এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষা হিসেবে। তারা নিজেদের জীবনের সায়েন্টিস্ট।
তারা একটা লক্ষ্য ঠিক করে (Hypothesis)।
সেটা অর্জনের জন্য কাজ শুরু করে (Experiment)।
তারা ফেইল করে (Data Collection)।
সেই ফেইলর থেকে শিক্ষা নিয়ে প্ল্যান চেঞ্জ করে আবার আগায় (Analysis & Iteration)।
আমার স্টার্টআপ ‘কাজকি ডট কম’ (KajKey Ltd.) যখন ফেইল করলো, তখন আমি কি ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম? হ্যাঁ, সাময়িক খারাপ লেগেছিল। কিন্তু আমি সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখিনি। আমি দেখেছি একটা ডেটা পয়েন্ট হিসেবে। সেখান থেকে আমি শিখেছি টিম ম্যানেজমেন্ট, ফান্ড রেইজিং এবং টেকনোলজিক্যাল গ্যাপগুলো কী ছিল। সেই শিক্ষাটাই আজ আমাকে ‘লার্নিং বাংলাদেশ’ বা ‘EndingScene Studio’-কে প্রফিটেবল করতে সাহায্য করছে।
যদি আপনি ফেইল করতে ভয় পান, তবে আপনি আসলে নতুন কিছু শিখতে ভয় পাচ্ছেন। মনে রাখবেন, “Success needs vision, but execution needs iteration.”
৩. AI আপনার শত্রু নয়, আপনার ‘সুপার পাওয়ার’
এখনকার হট টপিক—”AI কি আমার চাকরি খেয়ে দিবে?”
উত্তর হলো—না, AI আপনার চাকরি খাবে না। কিন্তু যেই মানুষটা AI ব্যবহার করে নিজের এজেন্সিকে ১০ গুণ বাড়িয়ে ফেলবে, সে আপনার চাকরি খেয়ে দিবে।
আমি আমার লেটেস্ট রিলিজ হওয়া কোর্স ‘ন্যানো ব্যানানা মাস্টারক্লাস’-এ বা ওয়ার্কশপে বারবার একটা কথা বলি—AI কোনো জাদুর কাঠি না, এটা একটা টুল। আর যেকোনো টুলের একজন মাস্টার লাগে।
আগে একটা হাই-কোয়ালিটি ভিডিও বানাতে বা একটা প্রফেশনাল ই-মেইল ড্রাফট করতে আমার বা আমার টিমের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতো। এখন ChatGPT বা Gemini-কে সঠিক প্রম্পট বা ডিরেকশন দিয়ে সেটা নিমেষেই করে ফেলা যাচ্ছে।
এখানে ভয়ের কিছু নেই, বরং এটা হাই-এজেন্সি মানুষদের জন্য একটা বিশাল সুযোগ।
আপনার মাথায় একটা আইডিয়া আছে?
AI-কে ব্যবহার করে সেটা ভ্যালিডেট করুন।
রিসার্চ করুন।
কন্টেন্ট বা প্রোটোটাইপ বানান।
যারা লো-এজেন্সি, তারা AI-কে দিয়ে শুধু কপি-পেস্ট কাজ করাবে। আর যাদের ভিশন আছে, তারা AI-কে তাদের ‘কো-পাইলট’ বানিয়ে রকেট গতিতে আগাবে। আপনি যদি এখনো AI-কে ভয় পান, তার মানে আপনি এখনো নিজেকে ‘স্পেশালিস্ট’ বা ‘টেকনিশিয়ান’ ভাবছেন। কিন্তু আপনাকে হতে হবে ‘জেনারেলিস্ট’ বা ‘স্ট্র্যাটেজিস্ট’।
৪. স্পেশালাইজেশন পোকা-মাকড়ের জন্য, মানুষের জন্য নয় (Why Generalists Win)
একটা সময় ছিল যখন বলা হতো—”Jack of all trades, master of none.”
কিন্তু পুরো প্রবাদটা কি জানেন?
“A jack of all trades is a master of none, but oftentimes better than a master of one.”
১০-২০ বছর আগে হয়তো স্পেশালিস্টদের দাম ছিল। শুধু জাভা কোডিং জানলে বা শুধু ফটোশপ জানলেই চলতো। কিন্তু AI-এর যুগে এই স্পেশালিস্ট কাজগুলো অটোমেটেড হয়ে যাচ্ছে।
আজকের দিনে যিনি জিতবেন, তিনি হলেন একজন পলিম্যাথ (Polymath) বা জেনারেলিস্ট।
যিনি টেকনোলজি বোঝেন।
যিনি মানুষের সাইকোলজি বোঝেন।
যিনি সেলস এবং মার্কেটিং বোঝেন।
যিনি টিম লিড দিতে পারেন।
আমার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখবেন—আমি মার্কেটিং দিয়ে শুরু করেছি, মোশন গ্রাফিক্স শিখেছি, ভিডিও প্রোডাকশন করেছি, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট করেছি, এখন ই-লার্নিং এবং AI নিয়ে কাজ করছি। আমি কোনো একটা নির্দিষ্ট ‘টাইটেল’-এ আটকে থাকিনি। আমি নিজেকে পরিস্থিতির সাথে এডাপ্ট (Adapt) করেছি।
মানুষ হিসেবে আমাদের সবথেকে বড় শক্তি হলো এডাপ্টেবিলিটি। আপনি যদি নিজেকে শুধু “আমি একজন গ্রাফিক ডিজাইনার” বা “আমি একজন একাউন্টেন্ট” বলে সংজ্ঞায়িত করেন, তবে আপনি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছেন। আপনাকে হতে হবে এমন একজন, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে নতুন স্কিল শিখে সার্ভাইভ করতে পারে।
৫. মানুষের ৫টি সক্ষমতা যা AI সহজে নিতে পারবে না
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে আমরা কী শিখবো? বা আমাদের ভ্যালু কোথায়? Dan Koe-এর পডকাস্ট এবং আমার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আমি মানুষের ৫টি কোর সক্ষমতার কথা বলবো, যা মেশিনের পক্ষে রিপ্লেস করা কঠিন:
১. কম্পিউটেশন (মানসিক): তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমাদের আছে, কিন্তু মেশিনের স্পিড বেশি। তবে কোন তথ্যটা জরুরি আর কোনটা আবর্জনা—সেটা বাছাই করার ক্ষমতা মানুষের।
২. ক্রিয়েশন বা ট্রান্সফরমেশন: মেশিন জেনারেট করতে পারে, কিন্তু ‘ক্রিয়েট’ বা সৃষ্টি করার জন্য যে ইমোশন বা গল্পের প্রয়োজন, সেটা মানুষেরই আছে।
৩. ভেরিয়েশন (আইডিয়া): নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট করা। মেশিন পুরোনো ডাটা থেকে প্যাটার্ন বের করে, কিন্তু মানুষ একদম শূন্য থেকে বা অবচেতন মন থেকে নতুন কিছু ভাবতে পারে।
৪. সিলেকশন (বাছাই): হাজারটা অপশনের মধ্যে কোনটা আমার বিজনেসের জন্য বা আমার জীবনের জন্য সঠিক—এই ডিসিশনটা আপনাকেই নিতে হবে।
৫. অ্যাটেনশন বা ফোকাস: সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। কোন সমস্যার দিকে আপনি নজর দিবেন? আপনার ভিশন কী হবে? এটা মেশিন ঠিক করে দিবে না।
তাই মেশিনের সাথে কম্পিটিশন না করে, মেশিনের ল্যাকিংসগুলো বুঝুন এবং সেখানে নিজের হিউম্যান টাচ বা ‘এজেন্সি’ অ্যাপ্লাই করুন।
৬. এজেন্সি চর্চা করবেন কীভাবে? (অ্যাকশন প্ল্যান)
সবশেষে, থিওরি অনেক হলো। এখন প্র্যাকটিক্যাল কথায় আসি। আপনি কীভাবে নিজের মধ্যে এই ‘এজেন্সি’ তৈরি করবেন?
কনজ্যুমার থেকে প্রডিউসার হন: সারাদিন কন্টেন্ট কনজ্যুম না করে, নিজে কিছু একটা তৈরি করুন। সেটা একটা লেখা হতে পারে, একটা ভিডিও হতে পারে, বা ছোট একটা বিজনেস প্রজেক্ট।
গোল সেট করুন, কিন্তু ফ্লেক্সিবল থাকুন: একটা লক্ষ্য ঠিক করুন (যেমন: আমি ২০২৬ সালের মধ্যে মাসে ১ লাখ টাকা প্যাসিভ ইনকাম করবো)। এরপর সেটা এচিভ করার জন্য এক্সপেরিমেন্ট চালান। একটা পথ কাজ না করলে অন্য পথে যান।
সবকিছুতে ‘কেন’ প্রশ্ন করুন: সমাজ যা বলছে, তা অন্ধভাবে মেনে নিবেন না। কেন আমাকে এটা করতে হবে? এর চেয়ে ভালো উপায় কি নেই?—এই প্রশ্নগুলোই আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করবে।
রিসোর্সফুল হন: “আমার তো টাকা নেই”, “আমার তো ল্যাপটপ নেই”—এগুলো অজুহাত। আপনার হাতে একটা স্মার্টফোন আছে মানে পৃথিবীর সব জ্ঞান আপনার হাতের মুঠোয়। আমি নিজে ধার করা ল্যাপটপ আর সাইকেল চালিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছি। রিসোর্সের অভাব হয় না, অভাব হয় রিসোর্সফুলনেস (Resourcefulness)-এর।
ভবিষ্যৎ তাদের, যারা অপেক্ষা করে না। যারা পারফেকশনের আশায় বসে থাকে না। যারা ১০১ পদের রান্না করে মেহমানকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা না করে, বরং মেহমানের/কাস্টমারের বা নিজের জীবনের আসল নিড (Need) বুঝে অ্যাকশন নেয়। ২/৩ পদই রান্না করবো, যেটা মেহমান আসলেই খেতে পছন্দ করে, কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স করতে চায় এবং আপনিও অপচয় ও এনার্জি নষ্ট না করে সার্ভ করতে পারবেন।
আপনার জীবন, আপনার ক্যারিয়ার—এর স্টিয়ারিং হুইলটা নিজের হাতে নিন। ভুল করুন, শিখুন, এবং আবার চেষ্টা করুন। এটাই এজেন্সি। আর এটাই আপনাকে টিকিয়ে রাখবে।
Note to Self: লেখাটা পড়ার পর যদি মনে হয় আপনার মধ্যে সেই ‘ফায়ার’ বা এজেন্সি নেই, তবে হতাশ হবেন না। আজ থেকেই ছোট ছোট ডিসিশন নিজে নেওয়া শুরু করুন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। কারণ, “নিজ ভালো তো জগৎ ভালো।”


